AUTHOR

একটা কম বয়সী বাচাল, একরোখা, জেদী, লাজুক, বাংলা মিডিয়াম স্কুলের যেচে বাঁশ নেওয়া সাইন্সের ছাত্র।
আরো জানবেন ফেসবুক আছে তো
��

06/06/2018

(অ)প্রিয় প্রাক্তন

(অ)প্রিয় প্রাক্তন..,


   নাঃ,এখন আর তুমি তেমনটা প্রিয় নেই আমার কাছে..বরং একরাশ বিরক্তি ভর করে মনে,তোমার নাম মনে এলেই।তবুও লিখছি চিঠিটা..
প্রথমে না হয় একটু শুরুর দিনগুলোর কথাই মনে করি..চিঠিটা তাতে অল্প লম্বা হয়ে যাবে..পড়তে গিয়ে তুমি বিরক্ত হবে ..ধৈর্য তোমার বরাবরই কম..তাই তো মাত্র একবছরেই আমি বাতিল হয়ে গেছিলাম তোমার কাছে..
এই মনে আছে..আমাদের প্রথম দেখার দিনটা...?জানিই ভুলে গেছো।আমিই বরং মনে করিয়ে দিই..কলেজের তৃতীয় দিন ছিল সেটা।হেঁটে আসতে গিয়ে একটা বড় ইঁটের টুকরোতে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলে তুমি আমার উপর।আশ্চর্য ব্যাপার জানো,রোগা পাতলা আমি কিন্তু দিব্যি সামলে নিয়েছিলাম তোমায়..পড়ে যেতে দিইনি..অথচ কিছুদিন প্রেমপ্রেম খেলা খেলে তুমি কেমন অবলীলায় আমায় ফেলে রেখে চলে গেলে..!!
তোমায় প্রথম থেকেই  বেশ লাগতো আমার..না না সুন্দর তুমি ছিলেনা বরং একটু ছাপোষাইই,তবুও তোমার ওই বুদ্ধিদীপ্ত দুটো ঝকঝকে চোখ আর ওই বয়সেই গম্ভীর গলার স্বর বড্ড  টানত আমায় তোমার দিকে।জানতো তুমি তখন প্রায়ই একটা আকাশী শার্ট পড়ে কলেজে আসতে..তোমার দেখাদেখি তখন আকাশী হয়ে উঠেছিল আমার অনুরাগের রঙ..কলেজ যাবার আগে,আমার একমাত্র আকাশী চুড়িদারের নরম সাদা ওড়নাটা গায়ে ফেলে দুই ভ্রু'র মাঝে যখন কালো টিপটা বসাতাম..বিশ্বাস কর তখন আমার মনে যে অচেনা আউলবাউল ঢেউটা উঠত.. ওই সতের বছরের জীবনে ওটাই ছিল আমার শ্রেষ্ঠ অনুভূতি।
তোমার একটা সিলভার রঙের বাইক ছিল. রোজ ইচ্ছে করেই ওটার পাশটিতে আমার সাইলেকটা রাখতাম..ভাবতাম,আমি তোমার পাশে না থাকতে পারি..সাইকেলটাতো থাকলো..মাঝেমধ্যে তোমার একটু পরশের আশায় তোমার বাইকের হ্যান্ডেলটা ছুঁয়ে আসতাম..
তারপর না জানি কি জাদু করলেন উপরে বসা অদৃশ্য জাদুকর, হঠাৎই একদিন তুমি পিছু ডাকলে আমায়..ঠিক লাইব্রেরির সামনেটায়..চমকে,বিস্ময়ে,উত্তেজনায় আর ভয়ে থতমত খাওয়া আমার হাত থেকে বইগুলো সব মাটিতে পড়ে গেছিলো.  দেখে তুমি ঠোঁট টিপে হেসেছিলে..আর আমি..?...আমি তো তখন পৃথিবীর সবথেকে সুখী মেয়ে..!
কলেজে আচমকা তোমার সাথে চোখাচোখির মুহূর্ত, প্রথম বারের জন্য আমার হাত তোমার মুঠোয়,শেষ বিকেলের রাঙা আলোয় তোমার দেখান একরাশ মিথ্যে স্বপ্নের আবেশে অবশ আমার মাথা তোমার বাড়িয়ে দেওয়া কাঁধে.. অঝোর বৃষ্টি ঝরা দিনে নিঝুম ফাঁকা ক্লাসরুমে প্রথম বারের মত তোমার বুকে আমার মিশে যাওয়া..বড্ড ভালো ছিল জানো আমার জীবনেই ওই গোলাপি সময়টা..একদম বুঝিনি,গোলাপি রংটা যে খুব নরম..অল্পেই ফিকে হয়ে যায়...
এই..কেন গো তুমি আমার নরম মনটা নিয়ে খেললে..?মন কি তোমার প্রিয় খেলনা..?তবে তুমি কিন্তু দারুণ এক রাঁধুনি জান..আবেগগুলো হল তোমার রান্নার উপকরণ। আমার উষ্ণ ভালোবাসার ধোঁয়া ওঠা চা'য়ে ঠিক কতটা মেকি দরদের চিনি মেশাতে হবে ..আমার আকুলতার সাথে ঠিক কতটা সোহাগের ফোড়ন ছড়ালে সম্ভাষটা উপাদেয় হয়..যথাযথ জানতে তুমি।
তুমি প্রায়ই সাতকাহন করে শোনাতে তোমাদের বৈভবের কথা..বড় বাড়ি, চারচাকা গাড়ির কথা..তোমার উচ্চপদস্থ রেলকর্মী বাবার কথা..আমায়ও প্রায় জিজ্ঞেস করতে আমার বাপির জীবিকা নিয়ে..অবাক হতাম আমি..বলতাম ওই ছোটোখাটো একটা ব্যবসা আছে..
এইপর আসে আমার সেই আঠারো বছরের জীবনের সবথেকে অনভিপ্রেত দিনটি।তখন আমরা সেকেন্ড ইয়ার।কিছুদিন ধরেই তুমি আমায়, ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে অল্প এড়িয়ে যাচ্ছিলে..ওই দিন স্পষ্ট করেছিলে কারণটা।আমার চোখের সামনে তুলিকার হাত জড়িয়ে ধরে আমার দিকে আঙুল তুলে বলেছলে..-"ইউ আর নট মাই টাইপ..!!"..আমার অবাক ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিটা পলকেই ঝাপসা হয়ে গেছিলো..অনেক চেষ্টা করেও তোমার মুখটা কিছুতেই দেখতে পাচ্ছিলাম না...বেইমান চোখ দুটো যে তখন নুনের সাগর..!!!
কানে আসছিল তোমার শ্লেষ মেশানো স্বর..বলে চলেছিলে তুমি..-"আমাদের একটা ফ্যামিলি স্টেটাস আছে..কি পরিচয় দেবো তোমার ..?এক মুদিখানা দোকানির মেয়ে.?.."




যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম..কারো ভালোবাসার পরিমাপের একক তার বাবার ব্যবসার আকার হতেপারে..তা যে আমার অজানা..কোনোমতে চোখ মুছে তাকিয়েছিলাম তোমাদের দিকে..প্রকট ভাবে চোখে পড়েছিল বিদ্রূপ আর শ্লেষ উপচে পড়া তুলিকার দুটো বাদামী চোখ.. বুঝেছিলাম হয় তুমি কোনোদিনই আমার ছিলে না,নয়তো বহু আগেই তুমি তুলিকার হয়ে গেছো.।.পাগলপারা ভালোবেসে আমার প্রাপ্তির ঘরে জুটেছিল কেবল একটা শূন্য আর বেশ কিছুটা অপমান।
আজ প্রায় সাত বছর পর আমার বাবার অফিসে তোমায় একাউটেন্ট হিসেবে চাকরি করতে দেখে বেশ অবাকই হয়েছিলাম..তার থেকেও বেশি অবাক তুমি হয়েছিলে এটা বোঝার পর যে বিখ্যাত 'রিয়া ব্রান্ড ঘি'-এর মালিকের একমাত্র মেয়ে আমি..।জানতো, লোক দেখানো বিলাসিতা দিয়ে কক্ষনো কারো বৈভব, প্রাচুর্যের হদিশ পাওয়া যায় না।আমি সেইসময় তুলিকার মত স্কুটি নিয়ে কলেজ যেতাম না ঠিকই..কিন্তু সময় আমাদের গোটা মফস্বলে একমাত্র বি.এম.ডাব্লিউটা কিন্তু আমাদের বাড়ির গ্যারেজেই পার্ক করা থাকতো।আমায় ছেড়ে চলে যাবার দিন তুমি যে স্টেটাসের কথা বলেছিলে..সেদিন ইচ্ছে করলে আমি বলতে পারতাম যে তোমার আর তুলিকা দুইজনের বাবা কেই আমার বাবা দুই পুরুষ বসিয়ে খাওয়ানোর ক্ষমতা রাখেন..!




ভাগ্যিস বলিনি..বললে তুমি তুলিকাকে ছেড়ে আমার ঘাড়েই ঝুলতে..আমায় সারা জীবন টেনে চলতে হত এক প্রেমিকরূপী ব্যবসায়ী কে..তবে জানতো সেই বিখ্যাত লাইনটা..
-"জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখ হিসাবনিকাশ.. কিছুই রবে না.."
জানি তোমার মত ব্যবসায়ী মানুষরা কখনো ভালো থাকে না..তাই তোমায় ভালো থাকার উইশ না করেই চিঠিটা শেষ করলাম...
                                                  ইতি,                                          কেউ না..।।।।



(সমাপ্ত)




Author:- অনন্যা_দেবরায় |
আমাদের Facebook গ্রুপে জয়েন করুন এরকম আরও অসাধারণ গল্প পড়ার জন্য।
Touch to join our Facebook group

No comments:

Post a Comment