AUTHOR

একটা কম বয়সী বাচাল, একরোখা, জেদী, লাজুক, বাংলা মিডিয়াম স্কুলের যেচে বাঁশ নেওয়া সাইন্সের ছাত্র।
আরো জানবেন ফেসবুক আছে তো
��

30/05/2018

মধ্যবিত্তের একদিন

             -:  মধ্যবিত্তের  একদিন  :-
 
  ধবধবে ফর্সা দুটি পা। হালকা গোলাপী নখে মেঝে খুঁটতে খুঁটতে মেয়েটি জবাব দিল,

- আজকে পড়তে ইচ্ছা করছে না স্যার।
-কেন? 
-এমনি। আজ নাহয় গল্প করি? 
- আন্টি কোথায়? 
-মা তো খালামনির বাসায়।ফিরতে রাত হবে।

কথাটা শুনে রায়হানের তামাটে মুখে কেমন আঁধার নেমে এল। সাত তারিখ চলছে। এরা মাসের চার-পাঁচ তারিখের মাঝে বেতন দেয়। দু একদিন দেরি এমন কিছু নয়। কিন্তু আজ তার টাকাটা ভীষণ দরকার। 

আজকের পড়াগুলো রিভাইজ দিতে বলে রায়হান চেয়ার ছেড়ে উঠল।মেয়েটি জানালার দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে বলল,
-একটু বসে যান। বজ্রপাত হচ্ছে।যেকোন সময় বৃষ্টি নামবে।
-আসুক বৃষ্টি।
-ছাতা দিব? 
-দরকার নেই।

সিঁড়ি বেয়ে পাঁচ তলা নামতে না নামতেই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। দু'কদম এগিয়ে সে চায়ের দোকানে আশ্রয় নিল।

-একটা পলিথিন দেন মামা, ফোন ভিজে যাবে।
দোকানি কোনো কথা না বলে বিরস মুখে সাদা পলিথিন এগিয়ে দিল। রায়হানের  প্যান্টের বামপাশে ভাইব্রেশন জানান দিল ফোন এসেছে। রিসিভ করতে ওপাশ থেকে সিয়ামের উত্তেজিত চিৎকার,

- আরে দোস্ত, বাংলাদেশ জিতে গেল। আর তোর খবরই নাই।
- টিউশনে ছিলাম।
- আচ্ছা।তাড়াতাড়ি আয় দোস্ত।আমাদের বাড়ি পার্টির আয়োজন চলছে।কাচ্চি বিরিয়ানী..

- দূর। কী বলিস বৃষ্টিতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে  না। হ্যালো..... হ্যালো...

রায়হান  ফোন অফ করে পলিথিনে মুড়িয়ে নিল। শতচ্ছিন্ন মানিব্যাগের এক কোণায় দুটো দশ টাকার নোটের দিকে তাকিয়ে নিশব্দে হাসল। দোকানি আর কয়েকজনকে অবাক করে দিয়ে ঝুম বৃষ্টির মাঝে বেরিয়ে এলো।  লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছে।টাকাটা আজ তার ভীষণ দরকার।

বড় ফুপুর ফ্লাটের সামনে এসে রায়হান খেয়াল করল শরীর বেয়ে টুপটুপ করে পানি পরছে।এ অবস্থায় ভিতরে ঢুকলে বড় ফুপু মোটেও খুশি হবেন না।শত হোক, তার এত শখের কার্পেট।  কলিংবেল চেপে রায়হান মনে মনে প্রার্থনা করল,  বড় ফুপু যেন দরজা না খোলেন। দরজা খুলল প্রদীপ। বড় ফুপুর একমাত্র ছেলে। ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট বয়। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে  জিজ্ঞেস বলল,

-রায়হান ভাই, কেমন আছ? 
-ভালো।  ফুপু কোথায়?
-ঘুমাচ্ছে। তুমি ভিতরে এসে বসো।

-ভেজা শরীরে আর ভিতরে ঢুকব না।তোর কাছে পাঁচশ টাকা হবে? 

-ইয়ে... কাল পরশু দিলে হবে না?  আজ নেহার সাথে ডেট ছিল।

-থাক লাগবে না। যাই তাহলে।

রায়হান যাবার জন্য পা বাড়াল।পিছন থেকে প্রদীপ ডাকল,
-রায়হান ভাই রাগ করলে?
শুষ্ক মুখে বিরস হাসি ফুটিয়ে রায়হান উত্তর দিল,
-রাগব কেন?  ভাল থাকিস।

রাস্তার মোড়ের মুদি দোকান এখনও বন্ধ হয় নি।সামনের বেঞ্চিতে পা ছড়িয়ে বসে রায়হান অর্ডার দিল,

-আবুল ভাই, এক কাপ চা দেন।

দোকানে ভীড় নেই। আবুল মিয়া ধোঁয়া ওঠা রঙ চা হাতে দিয়ে খকখক করে কেশে উঠল। একটু কাশি থামতে জিজ্ঞেস করল,
- বৃষ্টিতে ভিজছেন কেমনে ভাইসাব?
রায়হান উত্তর না দিয়ে মাথা নাড়ল।
-মন মেজাজ খারাপ নি?
রায়হান এবারো চুপ।
আবুল মিয়া পাঁচটা একশ টাকার নোট বেঞ্চে রেখে বলল,
-আপনের তো মাসের শুরুতে টেকা লাগে না। আজ হঠাৎ এত দরকার..

দুই চুমুকে গরম চা শেষ করে রায়হান উত্তর দিল,
-দশ তারিখের আগে টাকা দিয়ে যাব। চায়ের দাম রাখো...

দুই কামরার ঘর।সামনের বারান্দার চৌকিতে রায়হান ঘুমায়। তার একপাশে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে সবাই খাওয়াদাওয়া করে।

রায়হানের প্লেটে পালংশাক তুলে দিয়ে মা বলল,
-শরীরটা ভালো না।আজ শাকপাতা দিয়েই খা।মাছ রাঁধতে পারলাম না।
এ বাড়িতে সপ্তাহে চারদিন  পাঁচ মেশালি তরকারীই ভরসা। এক দিন ডিম, দু'দিন টেনেটুনে মাছের যোগাড় হয়। তবু কী সুন্দর অভিনয়! 

রায়হান আর এক চামচ ভাত প্লেটে নিয়ে বলল,
-বাবা ঘুমিয়ে গেছে?
-হুম।
-নীতু?
-ও ঘুমিয়ে গেছে।
রায়হান একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
;
;
খাওয়া শেষে রায়হান পা টিপে টিপে নীতুর ঘরে এলো।এতবড় মেয়ে এখনো হা করে ঘুমায়। দেয়ালে কিছু কাঁচা হাতে আঁকা ছবি।মেয়েটি ছবি আঁকতে বড় ভালোবাসে। পাশের নর্দমা থেকে পচা দূর্গন্ধের সাথে সাথে ইয়া বড় বড় মশারা বেড়াতে আসে। অলস মেয়েটা তবু মশারি টানাতে ভুলে যায়। রায়হান আলগোছে নীতুর খাটে মশারি টানিয়ে বালিশের একপাশে নতুন কেনা জ্যামিতি বক্স আর জলরঙের বক্স রাখল। মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,

-শুভ জন্মদিন ছোট বোন.....

#সমাপ্ত

লেখিকাঃ HABIBA SARKAR HILA
আমাদের গ্রুপ জয়েন করতে touch here

No comments:

Post a Comment